কোন ধারণা থেকে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি বা বের করে আনার প্রক্রিয়াকে ব্যবসা উদ্যোগ বা ব্যবসায়িক উদ্যোগ বলে। অর্থাৎ নতুন কোন পণ্য বা সেবা সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারে জায়গা করে নিয়ে মুনাফা উপার্জন করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় মূলধন ও শ্রম পুঞ্জিভূত করে যোগ নিয়ে কোন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নকশা সৃষ্টি ও পরিচালনা করার ইচ্ছা ও সামর্থ্য বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টাকে ব্যবসায় উদ্যোগ বলে। আরও দেখুনঃ এক্সপ্রেস ভিডিও বাংলা দেখুন এখানে – Express Video Bangla

Google News
ব্যবসা উদ্যোগ

ব্যবসা উদ্যোগ উচ্চমাত্রায় ঝুকিপূর্ণ আবার একই সাথে ফলপ্রদ ও হতে পারে। এবং এর ফলে অর্থনৈতিক সম্পদ সৃষ্টি হতে পারে। যে ব্যাক্তি এরকম নতুন ছবি কোন ব্যবসা শুরু করেন ও এই ব্যবসার ফলে লব্ধ মুনাফার সিংহভাগ উপভোগ করেন তাকে ব্যবসায় উদ্যোক্তা বলে।

ব্যবসা উদ্যোগ ও উদ্যোক্ত

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালা বদলে ব্যবসা উদ্যোগ বিষয়ে কোন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নাই। পরবর্তীতে অর্থাৎ আশির দশকে এসে রাষ্ট্র যখন বেসরকারিকরণ অর্থনীতিকে স্বাগত জানায় তখন থেকেই মূলত ব্যবসায়ী উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ফলে ধীরে ধীরে সরকারিবেসরকারি উদ্যোগে এর কাঠামোগত পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্র এ শিক্ষার প্রতি বেশ গুরুতর করে এবং এই শিক্ষার উন্নয়নের বেশ কিছু প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমাদের আজকের আর্টিকেলে ব্যবসায় উদ্যোগ কী, শিল্প উদ্যোক্তা কাকে বলে, উদ্যোক্তাকে ব্যবসায়ের নেতা বলা হয় কেন, ব্যবসায়ীর উদ্যোগ ও উদ্যোক্তার ধারণা, উদ্যোক্তার গুণাবলী, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে ব্যবসায় উদ্যোক্তার অবদান, ব্যবসায়ী উদ্যোগ গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ, বাংলাদেশের ব্যবসায় উদ্যোগ উন্নয়নে বাধা ও সমাধান এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।

সাধারণত যে কোন কাজের কর্ম প্রচেষ্টা বা তৎপরতাই হলো উদ্যোগ। ব্যবসায় কোন একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। একটি ব্যবসায় স্থাপনের চিন্তা বা ধারণা সনাক্তকরণ থেকে শুরু করে ব্যবসায় স্থাপন ও সফলভাবে পরিচালনা করাই হলো ব্যবসায় উদ্যোগ। বিষদ ভাবে বলতে গেলে ব্যবসায় উদ্যোগ বলতে বোঝায় মুনাফা অর্জনের আশায় লোকসানের সম্ভাবনা মাথায় রেখেও ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসার স্থাপনের জন্য দৃঢ় চিত্ত ও মনোবল নিয়ে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা।

মানুষের চাহিদা পূরণের প্রচেষ্টা থেকেই মূলত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের শুরু। এরূপ গতিশীল ও সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের রূপকার হলেন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায় উদ্যোক্তা বা শিল্প উদ্যোক্তা। ইংরেজি Entrepreneur শব্দটি ফরাসি entreprendre শব্দ হতে উদ্ভব হয়েছে যার অর্থ হলো To undertake অর্থাৎ কোন কিছু দায়িত্ব গ্রহন করা অর্থাৎ উদ্ভাবন এবং ব্যবসায়ের মাধ্যমে প্রয়োজন ও অভাব পূরণ করা।

উদ্যোক্তার গুণাবলী

উদ্যোক্তা হলেন ব্যবসায় বা শিল্পের নেতা। তিনি যেভাবে নেতৃত্ব দেন ব্যবসা করার শিল্প সেভাবে গতিপ্রাপ্ত হয়। যদিও অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্যোক্তার ভূমিকা কে তেমন কোন স্বীকৃতি দেননি। কিন্তু আধুনিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে উদ্যোক্তার ভূমিকা আজ সর্বজনীন স্বীকৃত। একজন সফল উদ্যোক্তার গুণাবলী গুলো হল:

  • দূরদর্শিতা
  • কৃতিত্তার্জন প্রেষণা
  • উদ্ভাবনি শক্তি
  • ঝুকি গ্রহণের ক্ষমতা
  • সাংগঠনিক দক্ষতা
  • প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা
  • ধৈর্য ও কষ্ট সহিষ্ণুতা
  • শারীরিক ও মানসিক শক্তি
  • গতিশীল নেতৃত্ব
  • চারিত্রিক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস

ব্যবসায় উদ্যোগের বৈশিষ্ট্য

উদ্যোগ যেকোন বিষয়ের ব্যাপারেই হতে পারে। কিন্তু লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে অর্থ শ্রম বিনিয়োগ করাই হলো ব্যবসায় উদ্যোগ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মনে করো তুমি বাশ ও বেত দিয়ে সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করতে পারো এখন নতুন এক ধরনের বেতের চেয়ার দেখে সেটা বানানোর চেষ্টা করলে। এটি তোমার উদ্যোগ। এখন তুমি যদি অর্থ সংগ্রহ করে বাস ও বেতের সামগ্রী তৈরির দোকানে স্থাপন করে সফলভাবে ব্যবসায় পরিচালনা করো তখন এটি হবে ব্যবসায় উদ্যোগ। ব্যবসায় উদ্যোগের ধারণা বিশ্লেষণ করলে যে সকল বৈশিষ্ট্য ও কার্যাবলী লক্ষ্য করা যায় তা হল:

  • এটি ব্যবসায় স্থাপনের কর্ম উদ্যোগ। ব্যবসা স্থাপন সংক্রান্ত সকল কর্মকান্ড সফলভাবে পরিচালনা করতে ব্যবসা উদ্যোগ সহায়তা করে।
  • ঝুকে আছে জেনেও লাভের আশায় ব্যবসায় পরিচালনা। ব্যবসায় উদ্যোগ সঠিকভাবে ঝুঁকি পরিমাপ করতে এবং পরিমিত ঝুকি নিতে সহায়তা করে।
  • ব্যবসায় উদ্যোগের ফলাফল হল একটি ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। এর মানে হলো ব্যবসায় উদ্যোগ সম্পর্কে ধারণা কোন চিন্তা ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করে।
  • ব্যবসায় উদ্যোগের অন্য একটি ফলাফল হল একটি পণ্য বা সেবা।
  • ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটি সফলভাবে পরিচালনা।
  • নিজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। ব্যবসায় উদ্যোগের মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তা নিজের উপার্জনের ব্যবস্থা করতে পারেন।
  • অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ব্যবসায় উদ্যোগ মালিকের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন।
  • নতুন সম্পদ সৃষ্টি করা। ব্যবসার উদ্যোগের মাধ্যমে যেমন মানবসম্পদ উন্নয়ন হয় তেমনি মূলধনও গঠন হয়।
  • সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা। ব্যবসায় উদ্যোগ দেশের আয় বৃদ্ধি ও বেকার সমস্যার সমাধান সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে।
  • মুনাফার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা গ্রহণ করা। ব্যবসায় উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করে।

উদ্যোগ ও ব্যবসায় উদ্যোগের মধ্যে পার্থক্য

নং  উদ্যোগব্যবসা উদ্যোগ
যেকোনো কাজের কর্মপ্রচেষ্টাকেই উদ্যোগ বলে।মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ঝুঁকি নিয়ে অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করে ব্যবসায় স্থাপনাকে ব্যবসায় উদ্যোগ বলে।
উদ্যোগে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকা বাধ্যতামূলক নয়।ব্যবসায় উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো মুনাফা অর্জন।
উদাহরণ: স্কুলের প্রতিষ্ঠাবাষির্কী পালনের বাধ্যতামূলক নয়।উদাহরণ: মুদি দোকান প্রতিষ্ঠা করা একটি ব্যবসায় উদ্যোগ।

ব্যবসায় উদ্যোগের সাথে ঝুঁকির সম্পর্ক

ব্যবসা উদ্যোগের সাথে ঝুঁকির সম্পর্ক সর্বদা বিদ্যমান। কোন ব্যবসায় ঝুঁকি কম আবার কোন ব্যবসায় ঝুঁকি বেশি। যে ব্যবসায় ঝুকি বেশি সে ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনা ও তত বেশি। আমার যে ব্যবসায় ঝুঁকি কম তাতে লাভের সম্ভাবনাও কম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে মুদি দোকানে ঝুঁকি কম তাই মুনাফা ও সীমিত। অন্যদিকে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মতো ব্যবসায়ী যেমন অনেক লাভের সম্ভাবনা আছে তেমনি অত্যাধিক ঝুঁকিও আছে। আরও দেখুনঃ ছবি সংগ্রহ

ব্যবসায় উদ্যোক্তার যে তিনটি প্রধান বাধার সম্মুখীন হয়, সেগুলি হলঃ 

  • আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে উত্তরণ (লাল ফিতা), 
  • দক্ষ বা মেধাবী লোকদের চাকুরিতে নিয়োগ দান এবং অর্থের সংস্থান। 
  • তাই বাস্তব বিশ্বে সম্ভাবনাময় নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির সিংহভাগই তহবিলের অভাব, ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, সরকারী নীতি, অর্থনৈতিক সংকট, বাজারে চাহিদার অভাব, বা এগুলির বিভিন্ন সমবায়ের কারণে বিফল হয়ে ক্ষতির শিকার হয়।

বিশেষজ্ঞ উদ্যোক্তারা নির্দিষ্ট কোনও ক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে থাকে ও ঝুঁকি না নিয়ে ধীরগতিতে বর্ধনশীল ব্যবসা সৃষ্টি করে। উদ্যোক্তারা মূলত চার ধরনের প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেঃ

  • ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (বিদ্যমান বাজারের একটি অংশ হিসেবে থাকতেই সন্তুষ্ট), 
  • সম্ভাবনাময় নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (কম সময়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির অভিলাষ), 
  • বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নতুন শাখা এবং 
  • সামাজিক উদ্যোগ (অলাভজনক)। 

উদ্যোক্তারা বহুবিষয়ে কুশলী, ঘাতসহ, নমনীয়, পাটোয়ারি (অর্থের হিসাব) ও ব্যবসায়িক বুদ্ধির অধিকারী, লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধকারী ও ভাল যোগাযোগ স্থাপনকারী হয়ে থাকে। তাদেরকে উচ্চমাত্রায় অধ্যবসায়ী, পরিশ্রমী ও নিবেদিতপ্রাণ হতে হয়। তারা উচ্চমাত্রায় উদ্বুদ্ধ ঝুঁকি-গ্রহণকারী হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের একটি রূপকল্প থাকে এবং সেই রূপকল্প অর্জনের জন্য তারা প্রচুর ত্যাগস্বীকার করে। উদ্যোক্তাদের কর্মকাণ্ড একটি অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, কেননা তাদের সৃষ্ট ব্যবসাগুলি বহু মানুষের কর্মসংস্থান করে ও বাজারে ভোক্তাদের ক্রয়ের জন্য পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে।

বাংলাদেশে ব্যবসা উদ্যোগ উন্নয়নে বাধা দূরীকরণের উপায়

উপরিল্লিখিত সমস্যাসমূহ বা বাধাসমূহ নিম্নোক্ত উপায়ে সমাধান করা যেতে পারে।

  • সুষ্ঠু ও বাস্তবনির্ভর পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
  • জাতীয় বাজেটে ব্যবসায় উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ করতে হবে এবং উক্ত বরাদ্দ যথাযথ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • বিসিক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বেশি স্থাপনের মাধ্যমে দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
  • সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সফল উদ্যোক্তাদের জীবনী বা কেস স্টাডি তুলে ধরতে হবে।
  • দেশের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার কারিকুলাম ও পাঠ্যক্রমে ব্যবসায় উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • বাংলাদেশে ব্যাংক ও ঋণ প্রদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এ সেক্টরে যে ঋণ প্রদান করে তার মুনাফা বা সুদের হার বেশ বেশি। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ খুবই জরুরি।
  • রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগ এবং সাহায্য-সহযোগিতা উন্নয়ন জরুরি। প্রয়োজনে এর জন্য পিপিপি অর্থাৎ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ বা সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্যাকেজ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।
  • সরকারি দলের সাথে সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের সহঅবস্থান নিশ্চিত করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে।

উপরিউক্ত ব্যবস্থাদি গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশে ব্যবসা উদ্যোগ উন্নয়নে অমিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে। ফলে এর থেকে প্রাপ্ত কাঙ্ক্ষিত মাত্রার সুফল সকল দেশবাসী ভোগ করতে পারবে।