দেশ বা জাতি গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা রচনা- সংকেত: ভূমিকা; ছাত্র সমাজ ও জাতীয় দায়িত্ব; অধ্যয়ন ও অধ্যবসায়; ছাত্রসমাজ ও সমাজসেবা; ছাত্রসমাজ ও রাজনীতি; ছাত্রসমাজের সাংস্কৃতিক অবদান; সামাজিক সমস্যা নিরসনে ছাত্রসমাজ; শিক্ষা বিস্তারে ছাত্রসমাজ; অর্থনৈতিক উন্নয়নে ছাত্র সমাজের ভূমিকা; উপসংহার।

রচনা

দেশ বা জাতি গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা রচনা

ভূমিকা:

ছাত্রজীবন হলো মানবজীবন গঠনের শ্রেষ্ঠ সময়। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে “Student life is seedtime of life” অর্থাৎ জীবনের বীজ বপনের সময় হচ্ছে ছাত্রজীবন। প্রকৃতপক্ষে, মানব চরিত্রের মহৎ গুণাবলীগুলো আয়ত্ত করার উপযুক্ত সময় এই ছাত্রজীবন। কেবলমাত্র অধ্যয়নই ছাত্রজীবনের একমাত্র কর্তব্য হতে পারে না বরং একজন ছাত্রের অধ্যয়নের পাশাপাশি নিজেকে মহৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আরো অনেক দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে হয়। দেশ ও জাতির উন্নতির লক্ষ্যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছাত্রদের সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন অপরিহার্য।

ছাত্রসমাজ ও জাতীয় দায়িত্ব:

ছাত্রজীবনে অবশ্য পালনীয় দায়িত্বের প্রধান দুটি অংশ। প্রথমত, নিজেকে অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তোলা; দ্বিতীয়ত, দেশ ও জাতির অগ্রগতির ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে যাওয়া। ছাত্ররাই হলো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতীক, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক। ছাত্ররাই জাতির আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে জাতিকে বিশ্ব দরবারে সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করতে পারে। ফলে স্বভাবতই, জাতির প্রতি ছাত্রদের দায়িত্ব-কর্তব্য, অন্যান্য সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় অনেক বেশি। যুগে যুগে ছাত্ররাই দেশ ও জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এমনকি জাতির ভবিষ্যৎ সংকটকালেও একমাত্র আশা-ভরসা এই তরুণ প্রাণোচ্ছ্বল, নিঃস্বার্থপরায়ণ ছাত্রসমাজ।

আরও পড়ুনঃ Paragraph

অধ্যয়ন ও অধ্যবসায়:

বলা হয়- “ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ” অর্থাৎ অধ্যয়নই হচ্ছে ছাত্রদের একমাত্র তপস্যা। দেশ ও জাতি গঠনে অংশ নিতে হলে ছাত্রদের উচিত কঠোর অধ্যবসায়ে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তোলা। দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হলে গোটা ছাত্রসমাজকে উপযুক্ত এবং সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। নিরক্ষর, শ্রমবিমুখ, অলস জনগোষ্ঠী কখনোই জাতিগঠনে সহায়ক শক্তি হতে পারে না বরং জাতির জন্য তারা বোঝা স্বরূপ। একটি দেশের সাফল্যের প্রথম শর্ত, সেই জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং পরবর্তী শর্ত, কঠোর ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী করে গড়ে তোলা। আর তাই ছাত্রদের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব নিজেকে পরবর্তী কর্মজীবনের জন্য যোগ্য করে তৈরি করা এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে দেশগঠনে অংশ নেয়া।

ছাত্রসমাজ ও সমাজসেবা:

একথা সর্বজনবিদিত যে, ছাত্ররাই যাবতীয় সমাজসেবামূলক কাজে একান্ত নিঃস্বার্থভাবে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসে। বস্তুত সেবাধর্মের মাধ্যমে জীবনকে মহত্তর করে তুলতে ছাত্ররা সদা সচেষ্ট। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দুর্ভিক্ষ-মহামারী, দুর্ঘটনা, যুদ্ধ-বিগ্রহে পীড়িত অসহায় মানুষের পাশে ছাত্ররাই সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কোনো প্রকার যশ বা খ্যাতি পাওয়ার আশা না করেই তারা বিপন্ন মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানীয়, রক্তদান, চিকিৎসাসেবা এবং ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, ছাত্রজীবনই হলো সমাজসেবা চর্চার প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

ছাত্রসমাজ ও রাজনীতি:

মহাত্মা গান্ধী বলেছেন- “The Students are the future leaders of the country who could fulfill country’s hopes being capable.” উপমহাদেশীয় রাজনীতির অঙ্গনের একটা বড় জায়গা দখল করে আছে ছাত্ররা। এ অঞ্চলের বড় বড় আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রামগুলোর পরিচালনা করেছে মূলত ছাত্ররাই। যখনই কোনো অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে তখনই দেশ ও জাতির স্বার্থে ছাত্ররাই প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ গঠনের পেছনে সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছে এ দেশের ছাত্ররাই। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিবাদ ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, সর্বোপরি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রসমাজ। যদিও বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে তবু ইতিহাসে এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

আরও পড়ুনঃ রচনা

ছাত্র সমাজের সাংস্কৃতিক অবদান:

জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে ছাত্রসমাজের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের কাছে নিজেদের সৃষ্টিশীলতা দ্বারা একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরতে পারে ছাত্রসমাজ। একই সঙ্গে তারা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা, শিল্প, ইতিহাস এবং ভাষাবিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আর এর ফলে দেশ ও জাতির উন্নতি ত্বরান্বিত হয়।

সামাজিক সমস্যা নিরসনে ছাত্রসমাজ:

দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ ছাত্রসমাজ। আর তাই ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় জাতীয় ও সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা অতি দ্রুত লাঘব করা সম্ভব। তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা মাত্রাতিরিক্ত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। অত্যধিক জনসংখ্যা এসব দেশের উন্নতির পথে প্রধান অন্তরায়। দেশের ও সমাজের প্রয়োজনে ছাত্ররা জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। ছোট পরিবারের সুবিধা এবং বড় পরিবারের অসুবিধাসহ জনসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধিতে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে নিজ নিজ এলাকায় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করার মাধ্যমে ছাত্রসমাজ দেশের অজ্ঞ মানুষদেরকে সচেতন করে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির মতো মারাত্মক সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হবে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বর্তমানে সমাজ, দেশ সর্বোপরি রাষ্ট্রের জন্যই হুমকি স্বরূপ। এর ফলে ছাত্রদের স্বাভাবিক লেখাপড়ার পরিবেশ এবং জীবনযাত্রা ব্যাহত তো হচ্ছেই জাতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সমস্যা নিরসনে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্নীতি-সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং ক্ষমতা ও আইনের অপব্যবহার। এর ফলে জাতির অস্তিত্বে সংকট দেখা দিয়েছে। ছাত্রসমাজের সম্মিলিত, কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজ এসব আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। ছাত্ররাই জাতির ভবিষ্যৎ পথ নির্দেশক। অতএব, ছাত্ররা ন্যায়-নীতি ও সততার দীক্ষায় দিক্ষিত হয়ে ঘুষ, দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহীতা, সাম্প্রদায়িকতাসহ সকল প্রকার অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে জাতিকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

শিক্ষা বিস্তারে ছাত্রসমাজ:

শিক্ষা ব্যতীত কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। বলা হয়ে থাকে- “শিক্ষাই জাতীর মেরুদন্ড।” কিন্তু সচেতনতা ও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে জাতি শিক্ষার আলো থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হচ্ছে। জাতিকে নিরক্ষরতার কালো ছোবল থেকে মুক্ত করতে ছাত্ররাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। একজন ছাত্র তার শিক্ষার আলো দিয়ে চারপাশের নিরক্ষর মানুষগুলোর জীবন আলোকিত করতে পারে। যদিও পথশিশুদের শিক্ষাদান, নৈশ বিদ্যালয় পরিচালনা, বয়স্কদের সাক্ষরতা প্রদান প্রভৃতি কর্মসূচিতে অনেক আগে থেকে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে আরো ব্যাপকভাবে ও বিস্তৃত পরিসরে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ছাত্ররা ছুটির সময় এবং অবসরে বয়স্কশিক্ষা কেন্দ্র, গণশিক্ষা কেন্দ্র, নৈশ বিদ্যালয় এবং অস্থায়ী বিদ্যালয়ে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নিরক্ষরতা দূরীকরণে অংশ নিতে পারে। কেবল সাক্ষরতা দান করলেই চলবে না, একই সঙ্গে কৃষিবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কুসংস্কার, স্যানিটেশন পদ্ধতি প্রভৃতি সম্পর্কেও মানুষকে সচেতন করতে হবে। এভাবে নিজ নিজ এলাকায় ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে নিরক্ষরতা দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে, নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে ছাত্রসমাজের ভূমিকা:

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ছাত্রসমাজ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষি ও শিল্পে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন ও জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে ছাত্ররা অংশ নিতে পারে। নিজেদের উদ্যোগে প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি, মৎস্য চাষ, পশু ও হাঁস-মুরগীর খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব নিরসনেও অংশ নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ছাত্রসমাজের বিকল্প নেই।

উপসংহার:

ছাত্রদের সফলতা ব্যর্থতার উপর নির্ভর করে জাতির সুখ-সমৃদ্ধি, উন্নয়ন অগ্রগতি। আমাদের দেশসহ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছাত্রসমাজই অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। ছাত্ররা যদি সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতি গঠনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় তবেই জাতি মুক্তি লাভ করবে এবং বীরদর্পে এগিয়ে যেতে পারবে উন্নতির পথে।

Google News