বিশ্বায়ন রচনা সংকেত: ভূমিকা; বিশ্বায়নের সংজ্ঞা; বিশ্বায়নের উৎপত্তি; বিশ্বায়নের উদ্দেশ্য; বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্য; বিশ্বায়নের কারণ; বিশ্বায়নের সুফল; বিশ্বায়নের কুফল; আমাদের করণীয়; উপসংহার।

রচনা

এক নজরে

বিশ্বায়ন রচনা

ভূমিকাঃ

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে বিশ্বায়ন। যার মাধ্যমে বিশ্ববাসী তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নিজেদের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছে। যার ফলে জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাটি উঠে গিয়ে সমগ্র বিশ্ব একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। এ সম্পর্কে পল হারস্ট ও গ্রাহাম থমসন বলেন, ‘Globalization has become a fashionable concept in the social sciences.’

Google News

বিশ্বায়নের সংজ্ঞাঃ

‘বিশ্বায়নের’ ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Globalization যা Globe শব্দ থেকে এসেছে। সাধারণভাবে বলা যায় বিশ্বায়ন হলো একটি প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর মাঝে সমন্বয় সাধন হয়ে থাকে অথবা বিশ্বকে একীভূত করা হয়। বিশ্বায়নের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Red wood বলেন, “Globalization is the creation of single world market”. আবার মার্টিন আলব্রো বলেন- ‘বিশ্বায়ন হলো সামগ্রিক কমিউনিটির মধ্যে সমস্ত মানুষকে নিয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া।’ সুতরাং বলা যায় বিশ্বায়ন হচ্ছে সীমারেখাহীন বিশ্বব্যবস্থা, যার দ্বারা বিশ্বে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকে।

বিশ্বায়নের উৎপত্তিঃ

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্বায়ন শব্দটির প্রচলন ঘটে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষ দিকে ‘ক্লাব অব রোম’ অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর পাশ্চাত্য মডেলের সীমাহীন প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যে ঘোষণা দেয় সেখান থেকেই মূলত বিশ্বায়নের সূত্রপাত হয়। যার মাধ্যমে আজ বিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে একই বিশ্বসীমানা ও একই বিশ্ব সম্প্রদায়।

আরও পড়ুনঃ রচনা

বিশ্বায়নের উদ্দেশ্যঃ

বিশ্বায়ন ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো বাজার সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা, সরকারি ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণ হ্রাস এবং সরকারি সম্পত্তি ধারণার বিলোপ সাধন করে তা বেসরকারি আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের লক্ষ্য হলো স্নায়ুযুদ্ধের অবসান, পূর্ব-ইউরোপ ও পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ও নিয়ন্ত্রিত অর্থ ব্যবস্থার উপর গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্যঃ

বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়ন প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে চলছে। এর কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-

– বিশ্বায়ন একটি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

– প্রযুক্তির দ্বারা বিশ্বায়ন নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।

– বিশ্বায়ন একটি পরিবর্তনশীল বিষয়।

– বিশ্বায়ন নতুন কৌশলে নব্য উপনিবেশবাদের জন্ম দিয়েছে।

– বিশ্বায়ন সমস্ত বিশ্বের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে।

– বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদের ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে।

– বিশ্বায়ন উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

– একে অপরকে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে অর্থাৎ FU, AU, ASEAN বিশ্বায়নের সৃষ্টি।

– বিশ্বায়নের চলার যে গতি তাতে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় না।

বিশ্বায়নের কারণঃ

বিশ্বায়নের জন্য কোনো একক কারণ দায়ী নয় বরং এর পেছনে রয়েছে এক বা একাধিক কারণ। সেগুলো হলো –

তথ্য ও প্রযুক্তির বিকাশঃ

বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে তথ্য ও প্রযুক্তির অবাধ বিকাশ। আর এ বিকাশের ধারাবাহিকতায় ঔপনিবেশিক আমল হতে প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করা হয়। এরপর রেডিও টেলিভিশন, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট প্রভৃতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের একটা সেতুবন্ধন তৈরি করা হয়।

আরও পড়ুনঃ Paragraph

সমাজতন্ত্রের পতনঃ

নব্বই-এর দশকে সমাজতন্ত্রের পতন সংঘটিত হলে তার জায়গাটি দখল করে মূলত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আর এই শক্তির দ্বারাই পরবর্তীতে বিশ্বায়নের পথ প্রশস্ত হয়।

গণতন্ত্রের প্রসারঃ

একটা সময় রাজতন্ত্রের জোয়ারের ফলে বিশ্বায়নের ধারণাটিই স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের অবাধ প্রসারের ফলে বিশ্বায়নের গতিও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।

পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থাঃ

পৃথিবীতে স্থায়ী বলতে কিছু নেই। এই সাধারণ নিয়মের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। ঠিক একই সাথে বিশ্বায়নের বিকাশও ত্বরান্বিত হচ্ছে।

বহুজাতিক সংস্থাঃ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা জন্ম নিয়েছে। যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। আর এ সমস্ত বহুজাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বায়নের পথ সহজ হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন স্পৃহা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা খারাপ অবস্থায় পতিত হয়। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বিশ্বায়নকে স্বাগত জানায়।

বিশ্বায়নের সুফলঃ

বিশ্বায়ন একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার বেশ কিছু সুফল রয়েছে যা নিম্মরূপ-

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়নঃ

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে ইউরোপের দেশসমূহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক জোট গড়ার মাধ্যমে বিশ্বে সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে।

মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশঃ

বিশ্বায়নের ধারণার সাথে মুক্তবাজার অর্থনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলস্বরূপ বিশ্ববাজার ব্যবস্থার দ্বার সকলের কাছে উম্মোচিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য এখন মানুষের হাতের মুঠোয় এসেছে ই-কমার্স এর মাধ্যমে। এ ব্যবস্থায় বিশ্বের এক প্রান্তে বসে আরেক প্রান্তে ব্যবসায়ের কার্যাদি সম্পন্ন হচ্ছে।

বৃহদায়তন কর্মকান্ডের প্রসারঃ

বৃহদায়তন বাজার ব্যবস্থার যে বিস্তার লক্ষ্য করা যায় তাতে বৃহৎ উৎপাদন ও বিপণন সহজসাধ্য হয়েছে। আর এটি মূলত বিশ্বায়নের সুফল। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে মুনাফার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়ঃ

বিশ্বায়নের ফলে যেমন বিশ্ব খুব কাছাকাছি এসে কাজ করছে ঠিক তেমনি উন্নত দেশসমূহের জ্ঞান, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশ সহজে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। যার দরুণ বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয় সাধিত হচ্ছে।

যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নতিঃ

বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বে যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এ কথা সহজে বলা যায় যে, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে যোগাযোগ অধিক সহজতর। আবার তথ্যপ্রযুক্তিতে যে যতো উন্নত সে ততো উন্নয়ন করতে সক্ষম হচ্ছে।

বিশ্বায়নের কুফলঃ

বিশ্বায়নের সুফলের পাশাপাশি এর কিছু কুফলও লক্ষ্য করা যায়। সেগুলো হলো-

অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধিঃ

এক দেশের সাথে আরেক দেশের যে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে তা মূলত বিশ্বায়নেরই ফল হিসেবে বিবেচিত হয়।

অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টিঃ

বিশ্বায়নের ফলে যে দেশগুলো শিল্পে অনুন্নত সে দেশগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে শিল্প কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে বেকারত্বের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয়ঃ

উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা অধিক উন্নত বিধায় অনুন্নত দেশ উপকৃত হওয়ার আশায় একদিকে যেমন প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থাও ধ্বংস হচ্ছে।

গোপনীয়তা রক্ষা কঠিনঃ

ইন্টারনেট, ই-মেইল, ফ্যাক্স ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে অনুন্নত দেশগুলোর গোপনীয় দলিল, সংবাদ ও তথ্য অতি তাড়াতাড়ি বিদেশি প্রতিপক্ষের হস্তগত হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক সংকটঃ

বিশ্বায়নের দ্বারা সংস্কৃতি আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত। ধনী দেশসমূহের অপসংস্কৃতির প্রভাবে গরীব বা অনুন্নত দেশের সংস্কৃতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

আমাদের করণীয়ঃ

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশ্বায়নের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কতগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। যথা-

– তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে উৎসাহমূলক কর্মকান্ড ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

– জনশক্তির কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।

– প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে শিক্ষিত বেকারদের কাজে লাগাতে হবে।

– সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের শাসনের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

– দারিদ্র্য নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

উপসংহারঃ

বিশ্বকে একই আয়নায় দেখার জন্য বিশ্বায়নের সৃষ্টি। বিশ্বায়নের কিছু নেতিবাচক প্রভাব বা কুফল থাকলেও এটি তার আপন গতিতে চলমান। তাই এর নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে ইতিবাচক দিকগুলোর সুফল অর্জন করাই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর করণীয় হওয়া উচিত।