ডিজিটাল বাংলাদেশ রচনা- সংকেত: ভূমিকা; ভিশন ২০২১ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ; ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মসূচি; ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্দেশ্য; ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকারের পদক্ষেপসমূহ; একটি অশনি সংকেত; তবুও আশার আলো; উপসংহার।

রচনা

ডিজিটাল বাংলাদেশ রচনা

ভূমিকা:

আধুনিক যুগ বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির যুগ। বিজ্ঞানের গৌরবময় ভূমিকার জন্যই বিশ্বসভ্যতা আজ উন্নতির শীর্ষে । বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া কোনো দেশ তার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে পারে না। এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের প্রায় সকল দেশই বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিকে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে বিশ্বের সকল দেশের সাথে তাল মিলিয়ে যাওয়ার জন্য ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্প ঘোষণা করেছে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি ডিজিটাল দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

ভিশন ২০২১ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ:

ভিশন ২০২১-এর মূল লক্ষ্য হলো একটি সুখী, সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যা ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসাবে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতির স্থলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলছে জিডিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রম।

ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মসূচি:

জনগণের রাষ্ট্র: ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম অঙ্গীকার হবে ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে দেশ থেকে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে জনগণের রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করা।

মৌলিক চাহিদা পূরণ: রাষ্ট্রের জনগণ যেন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। সে বিষয়টি নিশ্চিত করা।

ডিজিটাল সরকার: সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সকল কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পাদন করা হবে। প্রচলিত সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে নেটওয়ার্ক, ইন্টার‌্যাকটিভ ও ডিজিটাল পদ্ধতি গ্রহণ।

ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থা: অনলাইনের মাধ্যমে ভূমি সংক্রান্ত সকল তথ্য, মালিকানা ও নিবন্ধন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা।

আরও পড়ুনঃ Paragraph

ডিজিটাল স্থানীয় প্রশাসন: কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সকল পর্যায়ের কাজে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা: জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান এবং দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করা।

ডিজিটাল আইন ও বিচার ব্যবস্থা: আইন ও বিচার ব্যবস্থায় ডিজিটাল পদ্ধতি প্রয়োগ করলে সহজেই অপরাধ সংক্রান্ত সকল কার্যবিধি সম্পাদন করা যাবে। এছাড়া প্রয়োজনমতো বায়োমেট্রিক, জিন পরীক্ষা, অপরাধীর অবস্থান নির্ণয়ের জন্য গ্লোবাল পভিশনিং সিস্টেম তৈরি করা ছাড়াও বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রধান লক্ষ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তি নির্ভর করা। ডিজিটাল ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা এবং সারাদেশ ব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ বিস্তৃত করা। ICT (Information and Communication Technology) শিক্ষাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া।

কৃষিক্ষেত্রে: বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এই কৃষিকে বাদ দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। আর এই জন্যই সনাতন পদ্ধতি বর্জন করে কৃষিকে করতে হবে প্রযুক্তি নির্ভর। প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে ৬ গুণ বেশি উৎপাদন সম্ভব।

চিকিৎসাক্ষেত্রে: সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় একমাত্র কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যাবে।

যোগাযোগক্ষেত্রে: আধুনিক বিশ্বকে বলা হয় Global village. প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ স্থাপন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠলে দেশের প্রতিটি মানুষ বিশ্ব তথ্য প্রযুক্তি মহাসড়কে সঠিকভাবে প্রবেশ করতে পারবে।

প্রকাশনার ক্ষেত্রে: প্রকাশনার ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। নির্ভূল তথ্য ও সঠিক বানান নির্ণয়ে কম্পিউটার প্রযুক্তি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে: ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তির অবদান অকল্পনীয়। যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার হিসাব খুব স্বল্প সময়ে নির্ভুলভাবে দেওয়া যায়। তাছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে বৈদেশিক লেনদেন, এটিএম কার্ডের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত ভাবে টাকা লেনদেন যা ডিজিটাল বাংলাদেশেরই আভাস।

শেয়ার বাজারের ক্ষেত্রে: বর্তমানে শেয়ার বাজারের সকল কার্যক্রম কম্পিউটার প্রযুক্তি নির্ভর। যার মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই লেনদেন করা যাচ্ছে। যা ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে: ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন। তাছাড়া ওয়েব সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদপত্র ঘরে বসেই পড়া যাচ্ছে।

অনলাইন তথ্য কেন্দ্র স্থাপন: অনলাইনভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করতে পারলে দেশের সকল মানুষ তার প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সহজেই জানতে পারবে। যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য একান্ত আবশ্যক।

আরও পড়ুনঃ রচনা

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকারের পদক্ষেপসমূহ:

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকার আইসিটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে এ খাতের সঙ্গে সকল সেক্টরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন:

– জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯ ইতিমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৯ মাসের স্বল্প, ৫ বছরের মধ্য ও ১০০ বছরের দীর্ঘ মেয়াদে ৩০৬টি কর্ম পরিকল্পনা বিদ্যমান।

– ২০০৯ এর নীতিমালায় বর্ণিত ৩০৬টি অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে ৩৯টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে সম্পর্কিত করা হয়েছে।

– ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তথ্য ও যোগাযোগ নীতিমালা ২০০৯ সংশোধন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে জনগণ অনলাইনে প্রয়োজনীয় সকল কাজ সহজেই করতে পারবে।

– আইটি খাতকে বিকশিত করতে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলায় ২৩২ একর জমিতে দেশের প্রথম হাইটেক পার্ক নির্মিত হয়েছে।

– কম্পিউটার ও আইটি বিষয়ে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য তরুণ সমাজকে নিয়ে সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৬৪টি জেলায় কম্পিউটার বিতরণ ও ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে সরকার কাজ করছে।

– দেশের সব জায়গায় নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ই-গর্ভনেন্স নামে একটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে।

– ২০০৮ সালে গৃহীত নীতিমালা অনুযায়ী যোগাযোগের ক্ষেত্রে ই-মেইলসহ আধুনিক ব্যবস্থাদির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।

– দেশে বর্তমানে প্রতিবছর ৪০০০ ছাত্র-ছাত্রী আইসিটি বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে। তাদেরকে দক্ষ পেশাজীবী মানবসম্পদে রূপান্তর করতে আইসিটি কর্পোরেট সিটি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

– নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করার লক্ষ্যে সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

– ডিজিটাল শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি কাজ করছে।

– বর্তমানে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সকল পর্যায়ের ভর্তি নিবন্ধন করা যাচ্ছে।

– মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

– মোবাইলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ফোন বিল প্রভৃতি প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

– সকল ধরণের পাঠ্যপুস্তক ইন্টারনেটের মাধ্যমে পড়ার সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

একটি অশনি সংকেত:

বাঙালি খুবই আরামপ্রিয় জাতি। যে জাতি বীরের বেশে অর্জন করেছে স্বাধীনতা সেই জাতি আজ অলসতার দায়ে অভিযুক্ত। যেহেতু জাতি আজ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অগ্রসর হচ্ছে, সেই সাথে একটি আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে গেলে দেশের মানুষ আরো বেশি কর্মবিমুখ ও অলস হয়ে যাবে। এই ডিজিটাল প্রযুক্তি কেড়ে নিবে মানুষের কাজ। দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে যাবে। অন্যদিকে আরামপ্রিয় মানুষ গৃহবন্দী হয়ে যাবে। ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলবে। ফলে জাতি প্রকৃত মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। তবে এটি নির্ভর করে ডিজিটাল বাংলাদেশ ব্যবস্থাপনার উপর।

তবুও আশার আলো:

পূর্ব আলোচিত অশনি সংকেতগুলো পড়লে মনে হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ কি তাহলে অকল্যাণ বয়ে আনবে? নিশ্চয়ই না, কারণ আলো-অন্ধকারের মতো সর্বক্ষেত্রে সুবিধা-অসুবিধা থাকবে। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্য ব্যবস্থাদি যদি দক্ষ মানুষের সমন্বয়ে করা যায় তাহলে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে যদি মানুষ কর্মের সুযোগ পায় তাহলে তারা যেমন আনন্দ লাভ করবে তেমনি তারা একেকজন দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে উঠবে।

উপসংহার:

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের তথ্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অতি সামান্য। তারপরও আমরা আশাবাদী। ডিজিটাল বাংলাদেশ শুধু সরকার প্রবর্তিত কোনো কর্মসূচি নয়, এটি জাতির গন্তব্য। বংলাদেশের বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিতে উন্নয়ন সাধন করা কঠিন ব্যাপার নয়। সরকারের সঠিক দিক নির্দেশনা, কর্মতৎপরতা ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে উন্নত জীবন-যাপন নিশ্চিত করা সম্ভব। আর তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলেই বাংলাদেশ একদিন সত্যিকাররূপে স্বপ্নের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান দখল করে নিবে।

Google News